মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

ভিশন ও মিশন

শিক্ষার লক্ষ্য ও প্রাথমিক শিক্ষাক্রম

বাংলাদেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন ১৯৯০ প্রবর্তনের পর প্রাথমিক স্তরে পর্যায়ক্রমে শতভাগ শিক্ষার্থী ভর্তির হার নিশ্চিত হয়েছে এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি বিশাল অর্জন। কিন্তু এই অর্জন পরিমাণগত, মানগত অর্জনের সাফল্যও নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ও প্রান্তিক যোগ্যতা পূরণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।

এ দেশের শিক্ষার্থীদের কতজন প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে—এ প্রশ্ন সম্প্রতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষ করে এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর জিপিএ ৫ প্রাপ্তি এবং পরবর্তী সময়ে তাদের একটি বড় অংশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন না করতে পারা সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কোনো কোনো শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এমন কথাও বলেছেন যে নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি না জেনেই বহু শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা বেশি দেখা যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা এ জাতির জন্য অশনিসংকেত।

স্বস্তির বিষয় হচ্ছে যে আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন নিজের ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়, সেদিকে সুনজর রয়েছে সরকারের। প্রাথমিক শিক্ষাক্রম থেকেই এ প্রসঙ্গে দৃষ্টিপাত লক্ষ করা যায়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক স্তরের নতুন শিক্ষাক্রমে ‘পরিবেশ পরিচিতি সমাজ’ বিষয়টির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ নামকরণ করা হয়েছে। এ বিষয় সম্পর্কে যদি শৈশবেই শিক্ষার্থীদের মনে স্পষ্ট ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে তাদের পক্ষে সুনাগরিক হয়ে ওঠার পথ সুগম হবে।

প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগ-অনুভূতির বিকাশ সাধন এবং তাদের দেশাত্মবোধে, বিজ্ঞানমনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্নদর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক স্তরের জন্য ১৩টি উদ্দেশ্য ও ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৩টি উদ্দেশ্যের মধ্যে ৯টি বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার প্রান্তিক যোগ্যতার মধ্যে ১৬টি বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নতুন প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬টি। যেমন—১. সমাজ, পরিবেশ ও পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে জানা এবং এগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব উপলব্ধি করা। ২. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুসহ (নারী-পুরুষ, শ্রেণি, জাতি, ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদি নির্বিশেষে) সবার সঙ্গে সহযোগিতা ও সম্প্রীতির মানসিকতা অর্জন করা। ৩. মৌলিক চাহিদা ও মানবাধিকার সম্পর্কে ধারণা অর্জন এবং বাস্তবজীবনে অনুশীলন করা। ৪. সমাজ ও রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে নিজের অধিকার, দায়িত্ব-কর্তব্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কে জানা এবং এগুলো অর্জন ও পালনে সচেতন হওয়া। ৫. ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের পরিচয়, যথাযথ ব্যবহার, সংরক্ষণ ও অপচয় রোধ করা। ৬. সব পেশাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া ও কায়িক শ্রমের প্রতি আগ্রহী হওয়া। ৭. পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শন ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুশীলন করা। ৮. নৈতিক ও সামাজিক গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে ভালোমন্দের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারা এবং তা বাস্তবজীবনে প্রয়োগ করা। ৯. বিভিন্ন ধরনের সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা এবং এগুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করা। ১০. দুর্যোগ সম্পর্কে জানা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার দক্ষতা অর্জন করা। ১১. পরিবেশদূষণের কারণ জানা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে অংশগ্রহণ করা। ১২. জনসংখ্যা সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জানা। ১৩. পৃথিবীর মহাদেশ ও মহাসাগরগুলো সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা অর্জন। ১৪. মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা ও এর চেতনায় দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হওয়া। ১৫. বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জানা এবং এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ও ভালোবাসা। ১৬. আন্তর্জাতিকতাবোধ, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বসংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া। উল্লিখিত প্রান্তিক যোগ্যতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ধারণা ও মূল্যবোধ অর্জন করে আজকের শিশু যেন ভবিষ্যতে পরিপূর্ণ ও সুনাগরিক হয়ে উঠতে পারে, তার উপকরণ রয়েছে এখানে। এ বিষয় থেকে একই সঙ্গে দেশপ্রেমিক ও বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার প্রেরণা পাবে তারা। এই মহৎ স্বপ্নের বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব, যখন শিক্ষকরা এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারবেন। এ লক্ষ্যে শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ আরোপ করতে হয়, স্বশিক্ষণ আসে নিজের ভেতর থেকে। প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, সুশিক্ষিত মানুষ মাত্রই স্বশিক্ষিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বশিক্ষিত শিক্ষকরাই পারেন ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বিষয়টির যথার্থ গুরুত্ব অনুধাবন করে শিশুদের শিক্ষিত করে তুলতে। এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা যদি পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারে, তবে শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জিত না হলে এর ফলাফল কত ভয়ংকর হতে পারে, এর কিছু ট্র্যাজিক দৃষ্টান্ত সম্প্রতি বাংলাদেশে স্থাপিত হয়েছে। জঙ্গিবাদ ও নাশকতার মতো অপশক্তির হাত থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে হলে শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এই অর্জনের জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকদের আন্তরিক ও উদ্যোগী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

ছবি


সংযুক্তি



Share with :

Facebook Twitter